নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ রুবেল আহমেদ
নওগাঁর নিয়ামতপুরে ১২ বিঘা জমি সংখ্যায় খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু লোভ, দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাসের আগুনে তা হয়ে উঠল চারটি প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এক নির্মম প্রতীক। আপন মানুষের হাতেই যখন আপনজনের মৃত্যু ঘটে, তখন ঘটনাটি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান হয়ে থাকে না; এটি সমাজের ভেতরের গভীর অসুখের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
গ্রামবাংলায় জমি শুধু সম্পদ নয়, এটি পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। নিয়ামতপুরের এই ১২ বিঘা জমিও তেমনই এক উত্তরাধিকার, যা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা ছিল শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমির দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মালিকানার দাবি, সন্দেহ আর দখলের লড়াই।
যেখানে একসময় একই উঠোনে বসে খাওয়া-দাওয়া করত সবাই, সেখানে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে দূরত্ব। কথার লড়াই থেকে মনোমালিন্য, আর সেখান থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এই রূপান্তরটা খুব দ্রুত ঘটে না, কিন্তু ঘটে নিঃশব্দে।
ঘটনার দিনটি ছিল অন্য দিনের মতোই সাধারণ কিন্তু জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ হঠাৎই ভয়াবহ রূপ নেয়। তাতে প্রাণ হারান চারজন। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো হত্যাকারী ও নিহতরা (পুলিশ সুত্রে) সবাই একে অপরের আত্মীয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, যখন বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকে, তখন তা শুধু আইনি সমস্যা হয়ে থাকে না; তা পরিণত হয় আবেগ, অহংকার ও প্রতিশোধের জটিল সংঘাতে।
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো মানুষের ভেতরের পরিবর্তন। অর্থনৈতিক চাপ, প্রতিযোগিতা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। ফলে “আপন মানুষ” আর নিরাপত্তার প্রতীক থাকছে না সবসময়।
এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ সত্যি প্রশংসনীয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মূল সমাধান সেখানে নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা, জমি সংক্রান্ত ডিজিটাল রেকর্ড ও স্বচ্ছতা, স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির শক্তিশালী ব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুরের এই ঘটনা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়, এক টুকরো জমির জন্য কি চারটি জীবন হারানোই নিয়তি?
সম্ভবত নয়। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত আমরা সম্পর্কের চেয়ে সম্পদকে বেশি গুরুত্ব দেব, ততদিন এই প্রশ্নের উত্তর বদলাবে না।
এই চারটি প্রাণ শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়,এটি আমাদের সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা।


