শাহারুল ইসলাম ঘোড়াঘাট দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা বলে ১০ বছরের শিশু তাসফিয়াকে রেখে গিয়েছিলেন সৎ বাবা শাফিউল। পরদিনই আবার জিনিসপত্র ও নতুন কাপড় কিনে দেওয়ার কথা বলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান।
এর পরদিন রাতে করতোয়া নদী থেকে উদ্ধার হয় তাসফিয়ার মরদেহ। মাঝের এই তিনটি দিন তাসফিয়া কোথায় ছিল, কী ঘটেছিল তার সাথে—তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজ, গোপন ফোনালাপ ও সৎ বাবার দেওয়া নানা অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ জুবাইদা বালিকা মাদ্রাসায় তাসফিয়াকে নিয়ে যান শাফিউল। মাদ্রাসার পরিচালিকা রমিছা জানান, ওই সময় শাফিউল নিজেকে তাসফিয়ার সৎ বাবা পরিচয় দিয়ে বলেন, শিশুটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাবেন। নিজের ও স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার কথা বলে তাসফিয়াকে সেদিন রাতে রাখার অনুরোধ জানান।
“বাচ্চাটা তখন খুব কান্নাকাটি করছিল। আমি ওকে কান্না থামাতে বলি। লোকটিকে আমি চিনিও না, জানিও না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চাটাকে রেখে তিনি দ্রুত বের হয়ে যান”—বলেন পরিচালিকা রমিছা। শাফিউল চলে যাওয়ার পর তাকে খুঁজতে বাইরে বের হয়েও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
পরদিন শনিবার (১৫ আগস্ট) শাফিউল মাদ্রাসায় না আসায় তাসফিয়াকে নিয়ে তার তদন্তের জন্য ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে যান পরিচালিকা। সেখানে শিশুটির সৎ দাদিসহ কয়েকজন নারীকে পাওয়া যায়। তারা তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে কোনো আপত্তি নেই বলে জানান। শাফিউল তখন বাড়িতে ছিলেন না। সেখান থেকেই শিশুটির মায়ের মোবাইল ০১৯৮৮৭৫৯৪৬৬ এই নাম্বারটি সংগ্রহ করেন পরিচালিকা এবং একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। পরে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় কাপড়চোপড় নিয়ে পরিচালিকার সঙ্গে চলে আসে।
সেদিন সন্ধ্যার পর শাফিউল তার ব্যবহৃত ০১৩৩১৪৮৪১৩৮ এই নাম্বার থেকে মাদ্রাসার ০১৭৩৬৮৯২৬৫৩ এই নম্বরে ফোন করেন। পরিচালিকা তাকে জানান, এভাবে কারো বাচ্চাকে কেউ কোথাও রেখে যায় না আপনি কাজটা ঠিক করেননি। পরে শাফিউল মাদ্রাসায় এসে বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই তাসফিয়াকে সেখানে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি গেলে শিশুটি হয়তো তার সঙ্গে বাড়ি চলে যেতে চাইত।
পরিচালিকার ভাষ্য, ওই সময় শাফিউল তাকে বিশেষভাবে বলেন, তাসফিয়ার মা বা রংপুর থেকে কোনো আত্মীয় এলে যেন শিশুটিকে তাদের সঙ্গে যেতে না দেওয়া হয়। এমনকি কেউ শিশুটির বিষয়ে জানতে চাইলে যেন তাকে জানানো হয়। এমনকি তার নিজের মা আসলেও যেন বাচ্চাকে যেতে না দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় সবকিছু তিনি দেখবেন বলেও জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাসফিয়ার আসল বাড়ি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার লালদিয়া গ্রামে। সে ওই গ্রামের লিজা বেগমের প্রথম ঘরের সন্তান। লিজার দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে তাসফিয়া ঘোড়াঘাটের ভর্ণাপাড়ায় তার সৎ বাবা শাফিউলের বাড়িতে দাদা-দাদির কাছে থাকত। তাসফিয়ার মা লিজা ও সৎ বাবা শাফিউল দুজনই ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেই সুবাদে পরিচয় এবং চার বছর আগে শাফিউল লিজাকে বিয়ে করে। আনুমানিক আড়াই বছর আগে রংপুরের বদরগঞ্জ বা মাদারগঞ্জ এলাকার জামতলী নামের একটি স্কুল বা মাদ্রাসা থেকে শিশুটিকে নিয়ে শাফিউল এবং লিজা পালিয়ে নিয়ে এসেছিল বলে জানা যায়।
পরিচালিকা বলেন, রংপুরে তাসফিয়ার মা লিজার আগে বিয়ে হয়েছিল। সেখানকার আত্মীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা শাফিউল তাকে জানিয়েছিলেন।
এরপর আসে রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে শাফিউল আবার মাদ্রাসায় গিয়ে তাসফিয়াকে ৫০ টাকা ও কিছু চকলেট দেন। সন্ধ্যার পর তিনি ফের মাদ্রাসায় যান। সেদিন পরিচালিকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে একটু বিশেষ কাজে বোনের বাসায় যাওয়ায় মাদ্রাসার দায়িত্বে ছিলেন অন্য এক শিক্ষিকা।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, শাফিউল তার নিজের এবং তাসফিয়ার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র মাদ্রাসায় রেখে ছবি তোলা ও শিশুটির জন্য ট্রাঙ্ক কেনার কথা বলে তাসফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান। মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজেও শিশুটিকে তার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানান পরিচালিকা। এরপর সে আর তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ফেরত দিয়ে যায়নি।
সেদিন রাত ৯টা ১৬ মিনিটে শাফিউলের মোবাইল নম্বর থেকেই মাদ্রাসার পরিচালিকার নম্বরে ফোন আসে। ফোনে তাসফিয়া কথা বলে জানায়, তার বাবা তাকে বিরামপুরে ভর্তি করে দিয়েছেন। পরিচালিকার দাবি, কথোপকথনের সময়, শিশুটির পাশে থাকা তার সৎ বাবা শাফিউল কথা বলার বিষয়গুলো বলে দিচ্ছিল।
পাঁচ মিনিট পরে পরিচালিকা আবার ফোন করে তার রেখে যাওয়া কাপড় চোপড় নিয়ে যেতে বললে তাসফিয়া জানায়, তার বাবা তাকে নতুন কাপড় কিনে দিয়েছেন। এরপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের আর যোগাযোগ হয়নি।


