সফিকুল ইসলাম, বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধি।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় সরকারি স্যানিটেশন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। “মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি” প্রকল্পের আওতায় টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে উজানচর ইউনিয়ন-এ ২২৯টি ল্যাট্রিন নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮০ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩২ টাকা। প্রতিটি ল্যাট্রিন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার ১০৮ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রায় দুই বছর পার হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
সরেজমিনে উজানচর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ল্যাট্রিন নির্মাণে নিম্নমানের ইট, সুরকি ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। রিং তৈরিতে দুর্বল মানের তার ব্যবহার এবং সিডিউল অনুযায়ী সামগ্রী না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে এসব ল্যাট্রিন অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় উপকারভোগীদের অভিযোগ, ল্যাট্রিন দেওয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও এখনো তারা কোনো সুবিধা পাননি। এতে এলাকাজুড়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অন্যদিকে ফরদাবাদ ইউনিয়ন-এ ২৪৫টি ল্যাট্রিন নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও মাত্র ১২৯টি নির্মাণ করেই পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবু সিয়ামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি-এর নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটিতে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ও কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আবদুল্লাহ আল মামুনকে সদস্য করা হয়।
তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্ত কমিটিকেও ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চলছে।
উজানচর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সুজন বলেন, “তদন্ত কমিটি গঠনের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মনে হচ্ছে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমি বদলি হয়ে গেছি। এরপরও আমাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলীকে বিষয়টি দেখার কথা বলেছি।”
অন্যদিকে তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান রিপোর্ট প্রকাশ না করেই হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই তদন্তও কি শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যাবে?
প্রকল্পের অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবু সিয়াম বলেন, “কয়েকজন উপকারভোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছিলাম। পরে ঠিকাদারকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি সমাধান করি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়েও শুনেছি। সরেজমিনে গিয়ে দেখবো।”
ফরদাবাদ ইউনিয়নে কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন না, এটা বাদ দেন।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তারিকুল ইসলাম বলেন, “উপজেলা প্রকৌশলী নিয়মিত অফিসে আসেন না। অপর সদস্য প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) মিজানুর রহমান হজে গেছেন। এজন্যই রিপোর্ট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে।”
এ বিষয়ে আবু সাইদ বলেন, “আমি বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবো।


