এম,এ,মান্নান,নিয়ামতপুর(নওগাঁ) প্রতিনিধি
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময় পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ছাত্ররা ছিল সামনের কাতারে। তাই ছাত্রসমাজের রায়, তাদের চিন্তাভাবনা ও মতামত কখনোই অবহেলার বিষয় নয়। তাদের সিদ্ধান্তেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হলো জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। এ কারণে “ডাকসু নির্বাচন জানিয়ে দিল আগামীর বাংলাদেশ ইসলামের বাংলাদেশ”—এই উক্তি কেবল একটি শ্লোগান নয়, বরং একটি নতুন সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।ডাকসুর জন্ম ১৯২২ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর। এটি মূলত ছাত্রদের দাবি-দাওয়া, নেতৃত্ব বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ডাকসু শুধু একটি ছাত্র সংসদে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জাতির গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ডাকসুর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ডাকসু-নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাগরণ ঘটায়।
মুক্তিযুদ্ধেও ডাকসুর নেতৃবৃন্দ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকেই স্পষ্ট যে, ডাকসু নির্বাচন ছাত্রসমাজের ভেতরে পরিবর্তনের স্রোতকে জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত করে।দীর্ঘ সময় ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ছাত্রসমাজ বারবার দাবি জানালেও নানা অজুহাতে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানান দেয় তাদের প্রত্যাশা ও অভিমুখ। এ নির্বাচনে ছাত্রসমাজ এমন এক বার্তা দিয়েছে, যা কেবল ক্যাম্পাস নয়, পুরো জাতির জন্য চিন্তার খোরাক। তাদের ভোটের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে যে, তরুণরা একটি ন্যায়নিষ্ঠ, স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক বাংলাদেশ চায়।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। স্বাধীনতার ঘোষণায় “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার” প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, যা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম মানুষের জন্য যে আদর্শ দিয়েছে, তা হলো—ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত সবার জন্য সমান অধিকার।ইসলাম ঘুষ, জালিয়াতি, শোষণ ও বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে।“ইসলাম” শব্দের অর্থই শান্তি। ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল—“পড়ো।”
নৈতিকতা ও মানবিকতা: সত্যবাদিতা, পরিশ্রম, সহযোগিতা, দয়া ও সহমর্মিতা ইসলামের মূল শিক্ষা।
যদি রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামের এ মূল্যবোধকে ধারণ করে, তবে বাংলাদেশ শুধু সমৃদ্ধিই অর্জন করবে না, বরং দুনিয়ার সামনে একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রসমাজের যে রায় প্রতিফলিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায় তারা এই মূল্যবোধেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে দেখতে চায়।আজকের তরুণ প্রজন্ম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—বেকারত্ব,দুর্নীতি,নৈতিক অবক্ষয়,মাদক ও সন্ত্রাস,বৈষম্য।তারা জানে, কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আদর্শিক দিকনির্দেশনা। ইসলাম সেই দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তাই ছাত্রসমাজ চায়:
একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র।শিক্ষা ও রাজনীতিতে নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, কিন্তু ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে।সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতা।
ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলে এই প্রত্যাশাগুলো প্রকাশ পেয়েছে।ডাকসু নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে ইসলামের বাংলাদেশ। এখানে ইসলাম বলতে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বোঝানো হয়নি। বোঝানো হয়েছে—ন্যায়, শান্তি ও সমতার রাষ্ট্রব্যবস্থা।
দুর্নীতি, ঘুষ ও অন্যায়ের অবসান।সত্য, ন্যায় ও সুশাসনের প্রতিফলন।শিক্ষায় আলোকিত, প্রযুক্তিতে উন্নত, কিন্তু নৈতিকতায় দৃঢ় একটি জাতি। ডাকসু নির্বাচন একটি প্রতীক। এটি আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, তরুণ প্রজন্ম কী চায়। তাদের কণ্ঠস্বরেই প্রতিফলিত হয়েছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন—একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ, যেখানে ইসলামের মূল্যবোধই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়—ডাকসু নির্বাচন জানিয়ে দিল আগামীর বাংলাদেশ ইসলামের বাংলাদেশ।ডাকসুর ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৯টিতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি তিনটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদকপদসহ (এজিএস) ডাকসুতে পদ আছে ২৮টি। এর মধ্যে সদস্যপদ ১৩টি।
ডাকসুতে কোন পদে কারা জয়ী হলেন দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।সহসভাপতি (ভিপি)—আবু সাদিক কায়েম—সাধারণ সম্পাদক (জিএস) —এস এম ফরহাদ
সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস)—মুহা মহিউদ্দীন খান
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক—ফাতেমা তাসনিম জুমা।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক—ইকবাল হায়দার।কমন রুম রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক—উম্মে ছালমা।আন্তর্জাতিক সম্পাদক—জসীমউদ্দিন খান।ক্রীড়া সম্পাদক—আরমান হোসেনছাত্র পরিবহন সম্পাদক—আসিফ আব্দুল্লাহ।ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক—মাজহারুল ইসলাম।স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক—এম এম আল মিনহাজ।মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক—মো. জাকারিয়া।সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক-মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ
গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক-সানজিদা আহমেদ তন্বি
সমাজসেবা সম্পাদক-যুবাইর বিন নেছারী।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সদস্য পদ রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে ১১টিতে জয়ী হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সদস্যরা। একটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। অন্যটিতে জয়ী বাম-সমর্থিত প্রার্থী।সাবিকুন নাহার তামান্না (১০০৮৪),সর্ব মিত্র চাকমা (৮৯৮৮),আফসানা আক্তার (৫৭৪৭),রায়হান উদ্দীন (৫০৮২),তাজিনুর রহমান (৫৬৯০),ইমরান হোসাইন (৬২৫৬),মিফতাহুল হোসাইন আল-মারুফ (৫০১৫),মো. রাইসুল ইসলাম (৪৫৩৫)
শাহীনুর রহমান (৪৩৯০),আনা


