এম,এ,মান্নান, নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
“প্রথম দিকে আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। অনেক সময় মনে হতো আর হয়তো পারব না। কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে গেছি। আজ আলহামদুলিল্লাহ, আমার আমের বাগান শুধু আমাকে নয়, আশপাশের মানুষকেও উপকার দিচ্ছে।”—বলছিলেন নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার শালবাড়ি গ্রামের সফল আমচাষী মনোয়ার হোসেন চন্দন।কৃষক পরিবারের সন্তান চন্দনের শৈশব কেটেছে জমি-খেতের কাজে সাহায্য করতে করতে। ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তবে বাস্তবতা ছিল কঠিন। শুরুতে সীমিত জমি, পুঁজি সংকট আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মিলিয়ে একের পর এক ব্যর্থতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। অনেক সময় লোকজন তাঁকে নিরুৎসাহ করত—“শুধু আম চাষ করে কিছু হবে না।”চন্দন বলেন, “যে জমিতে আমি আজ আমের বাগান করেছি, সেই জমি একসময় এটেল মাটি হওয়ায় কিছুই ফলানো যেত না। অনেকেই বলেছিল এই জমি নষ্ট, এখানে কিছু হবে না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। কষ্ট করে মাটি তৈরি করেছি, সার দিয়েছি, যত্ন নিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন সেই এক একর জমি থেকে হচ্ছে সুস্বাদু আম।” — বলছিলেন নওগাঁ জেলার সফল আমচাষী মনোয়ার হোসেন চন্দন।একসময় চাষাবাদের অনুপযোগী ছিল তাঁর জমি।এটেল মাটির কারণে সেখানে কোনো ফসলই ভালো হতো না। আশপাশের মানুষ মনে করত, জমিটি চিরকাল অনাবাদি হয়ে থাকবে। কিন্তু মনোয়ার হোসেন চন্দন ভিন্নভাবে ভাবলেন। তিনি বিশ্বাস করলেন, পরিশ্রম করলে আল্লাহ নিশ্চয়ই ফল দিবেন।চন্দন বলেন,“প্রথমে জমি একেবারেই শক্ত ছিল। আমি নিয়মিত চাষ দিয়ে, জৈব সার ব্যবহার করে ধীরে ধীরে মাটি নরম করি। বছরের পর বছর চেষ্টা করে জমিকে আবাদযোগ্য করি। আজ সেই জমিই আমার বাগান।”প্রথম বাগান করার সময় ঝড়ে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে যায়। তখন মনে হয়েছিল স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। নতুনভাবে আবার শুরু করি।”নতুন করে সাহস নিয়ে তিনি কৃষি অফিসের পরামর্শ নেন, অভিজ্ঞ চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উন্নত জাতের গাছ রোপণ করেন বাগানে—ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, হিমসাগরসহ নানা জাত। আধুনিক সেচব্যবস্থা ও জৈব সার ব্যবহার করেন। কয়েক বছর পরেই ফলন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।এখন মৌসুম এলেই তাঁর বাগান ভরে ওঠে আমে। নওগাঁর বাইরেও রাজশাহী, ঢাকাসহ দেশের নানা জায়গায় সরবরাহ করা হয় তাঁর আম।চন্দনের সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং এলাকার মানুষেরও উপকারে এসেছে। মৌসুমে তাঁর বাগানে কাজ করে বহু শ্রমিক। ফলে স্থানীয় বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।একজন শ্রমিক বলেন,
“চন্দন ভাইয়ের বাগানে মৌসুমে কাজ পেয়ে আমাদের সংসার চলে। উনি আমাদের খুব ভালোভাবে দেখাশোনা করেন।”কৃষক মনোয়ার হোসেন চন্দন সমাজে একজন ভালো মানুষ হিসেবেও পরিচিত। নতুন কোনো আমচাষী তাঁর কাছে গেলে তিনি আন্তরিকভাবে পরামর্শ দেন। তাঁর কাছে কৃষি শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের কল্যাণের মাধ্যম।
চন্দনের লক্ষ্য আরও বড়। তিনি চান বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও জনপ্রিয় হোক।তাঁর ভাষায়—
“আমাদের আমের মান দারুণ। যদি সঠিকভাবে রপ্তানি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে যাবে। আমি সেই স্বপ্ন নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।”মনোয়ার হোসেন চন্দনের গল্প হলো সংগ্রাম থেকে সাফল্যের অনুপ্রেরণামূলক গল্প। তিনি প্রমাণ করেছেন—পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে একজন সাধারণ কৃষকও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন।মনোয়ার হোসেন চন্দনের গল্প আমাদের শেখায়—হতাশার জমিতেও পরিশ্রমের বীজ বপন করলে সাফল্যের ফসল ফলানো যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, কোনো জমিই অনুর্বর নয়, যদি চাষির মন উর্বর হয়।


