সাহারুল ইসলাম ঘোড়াঘাট দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট পৌর এলাকার ৫নং ওয়ার্ডের লালবাগ ও কাদিমনগর গ্রামজুড়ে বিস্তৃত এক প্রাকৃতিক বিস্ময়ের নাম ‘লালদহ বিল’। উপজেলা সদর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই জলাধারটি কেবল একটি বিল নয়, বরং এটি স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অলৌকিক লোকগাথার এক জীবন্ত দলিল।
প্রায় ১৮.৫৫ একর আয়তনের এই বিশাল বিলটি বর্ষা মৌসুমে ধারণ করে এক মায়াবী রূপ। এসময় বিলের পানি উপচে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। বিলের মাঝখানে অবস্থিত উঁচু স্থলভাগ বা ‘টিলা’ সদৃশ দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ। লালদহ বিলের নাম শুনলেই একসময় চোখে ভাসত লাল ও সাদা শাপলার সমারোহ। যা দেখে মনে হতো প্রকৃতির বুকে কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে। বিলের চারপাশ জুড়ে ফুটে থাকত রকমারি বুনো ফুল। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য এখন অতীত। আগে শীত মৌসুমে এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি, বক, সহ দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির আনাগোনা দেখা যেত। নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটের কারণে এখন আর সেই পাখিদের কলকাকলি শোনা যায় না। বিলের তীরের সেই চিরচেনা ফুলের সুবাসও এখন হারিয়ে গেছে।
লালদহ বিলকে ঘিরে স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর গল্প। প্রবীণদের মতে, অতীতে এই বিলে বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য কেউ আসবাবপত্র বা সাংসারিক সরঞ্জাম চাইলে অলৌকিকভাবে পানির নিচ থেকে সেগুলো ভেসে উঠত। তবে শর্ত ছিল অনুষ্ঠান শেষে তা ফেরত দেওয়ার। সেই রহস্যময় আভিজাত্য এখন ফিকে হয়ে আসছে। এছাড়াও আগে এই বিলের অতল গভীরে মানুষ ও গবাদি পশু তলিয়ে যাওয়ার একাধিক রেকর্ডও রয়েছে। এলাকাবাসীর মনে আজও সেই ভয় কাজ করে। আশ্চর্যেও বিষয় হলো, প্রচণ্ড খরাতেও এই বিলের পানি কখনো শুকাতে দেখেননি এলাকাবাসী এবং এর গভীরতা পরিমাপ করা দুষ্কর। বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শতবর্ষী বিশাল আমগাছ। গাছটির সুশীতল ছায়ার কারণে স্থানটির নাম হয়েছে ‘শীতলী তলা’। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। অতীতে এখানে ঘটা করে দুর্গা পূজা ও শীতলী পূজা অনুষ্ঠিত হতো। পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলিতে মুখর এই স্থানটি দীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়াও একসময় লালদহ বিল ছিল দেশি প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছের ভাণ্ডার। এলাকার সাধারণ মানুষ এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে এই জলাধারে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক মাছের সেই প্রাচুর্য আগের মতো না থাকলেও বিলটির গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। বিলের পানিতে দেদারসে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা ও মুরগির লিটার (বিষ্ঠা)। এছাড়া নিয়মিত গরু গোসল করানোর ফলে পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। পানির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ায় বিলে আর কোনো প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বা জলজ গাছ জন্মাতে পারছে না। ফলে পুরো জলাশয়টি এখন একটি ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয়রা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে লালদহ বিল হতে পারে উত্তরবঙ্গের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। বিলের মাঝখানের টিলাটিকে সংস্কার করে বসার স্থান ও যাতায়াতের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করলে প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ভিড় জমাবে।
তারিখঃ০৩-০৪-২৬


