এম,এ,মান্নান,স্টাফ রিপোর্টার,নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
“যে দেশে কারিগরি শিক্ষার্থীর সংখ্যা যত বেশি, সে দেশ তত উন্নত”—এই কথাটি বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত এবং বাস্তবতাও তাই প্রমাণ করে। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশ কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে। কারিগরি শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে, যা শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথার যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। মুখে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। বিশেষ করে শিক্ষা প্রশাসনের অসংগতি ও অব্যবস্থাপনা কারিগরি শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরছে।
এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এমপি (Migration/Management Process/অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আবেদন) সংক্রান্ত আবেদন প্রক্রিয়া। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠানের জন্য যেখানে অনেক আগেই আবেদন লিংক প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কোনো আবেদন লিংক দেওয়া হয় না। এতে করে কারিগরি শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায় এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।
এই ধরনের প্রশাসনিক অবহেলা প্রমাণ করে যে, কারিগরি শিক্ষাকে বাস্তবে এখনও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রসাশনিক কর্মকর্তাবৃন্দ সভা-সেমিনার, বক্তব্য ও নীতিগত ঘোষণায় কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তা কার্যকর করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায় না। পরিকল্পনা থাকে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায় চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতা।
এর ফলস্বরূপ,কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে সাধারণ শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, যদিও দেশের শ্রমবাজারে দক্ষ কারিগরি জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই বৈপরীত্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষা শুধু চাকরির নিশ্চয়তা নয়, এটি উদ্যোক্তা তৈরিরও অন্যতম মাধ্যম। অথচ এই শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিক জটিলতা, অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়, তাহলে সেই শিক্ষা কখনোই উন্নয়নের হাতিয়ার হতে পারে না। তাই “কারিগরি শিক্ষার্থী বেশি মানেই দেশ উন্নত”—এই উক্তি বাংলাদেশে এখনও বাস্তব রূপ পায়নি।
পরিশেষে বলা যায়, কারিগরি শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে শুধু মুখের বুলি নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। আবেদন প্রক্রিয়ায় সমতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন না করলে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই কারিগরি শিক্ষাকে বাস্তব গুরুত্ব দিতে হবে—এটাই সময়ের দাবি।




