এম,এ,মান্নান,নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
প্রতি বছর ১ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস (World Breastfeeding Day)। মায়ের বুকের দুধ হচ্ছে শিশুর প্রথম ও সর্বোৎকৃষ্ট খাবার। এটি শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি শিশুর প্রথম টিকা। শিশুর শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো স্তন্যদানের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং মায়েদের স্তন্যদান করতে উৎসাহিত করা।১৯৯২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে এই দিবসটি উদযাপন শুরু করে। পরবর্তীতে বিশ্ব স্তন্যদান সপ্তাহ (১ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট) হিসেবে সারা বিশ্বে এই দিবস ও সপ্তাহ পালন করা হয়। ‘Step to Successful Breastfeeding’ বা “সফল স্তন্যদানে ১০ ধাপ” মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে এই প্রচারণা শুরু হয়। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৭০টিরও বেশি দেশ এই দিনটিকে স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করে থাকে।জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শিশুর জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় খাদ্য হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ। এতে শিশুর জন্য দরকারি সব পুষ্টিগুণ বিদ্যমান।মায়ের দুধে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা শিশুর দেহে জীবাণু প্রবেশ ঠেকায় এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। স্তন্যদান শিশুর সঙ্গে মায়ের এক দৃঢ় মানসিক বন্ধন সৃষ্টি করে, যা শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক।মাতৃদুগ্ধের জন্য কোনো ব্যয় লাগে না, এটি সর্বদাই প্রস্তুত এবং জীবাণুমুক্ত থাকে।শিশুকে নিয়মিত দুধ খাওয়ালে মায়ের অতিরিক্ত ওজন কমে আসে।স্তন্যদান মায়েদের স্তন ক্যানসার, জরায়ু ক্যানসার ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।নিয়মিত স্তন্যদান প্রাকৃতিকভাবে সন্তান নিতে কিছুটা বিলম্ব ঘটায়, যা পরিবার পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে।মায়েদের স্তন্যদান বিষয়ে সচেতন করা।মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর স্বাস্থ্যগত সুবিধাগুলি তুলে ধরা।মা ও শিশুর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মায়েরা নির্বিঘ্নে স্তন্যদান করতে পারেন।কর্মজীবী মায়েদের কর্মক্ষেত্রে স্তন্যদানের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার দাবি জানানো। বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবার স্তন্যদানের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত নয়। অনেক মা সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না, আবার অনেকেই প্রথম দুধ (কলস্ট্রাম) ফেলে দেন, যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব সমস্যার সমাধানে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা ও কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহ যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই দিবসটি বাংলাদেশে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়, যাতে করে জাতির ভবিষ্যৎ—শিশুরা—সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
গর্ভবতী ও নবজাতক সন্তানের মায়েদের জন্য ব্যাপক স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।হাসপাতাল ও ক্লিনিকে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো বিষয়ে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে।কর্মজীবী মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে স্তন্যদান কক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে।গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা দরকার।
পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে যাতে স্তন্যদানকে সমাজে স্বাভাবিক ও গর্বের বিষয় হিসেবে দেখা হয়।বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন মা যখন তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তখন তিনি কেবল একজন অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন না, বরং একটি জাতিকে সুস্থ, সবল ও সক্ষম করে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। আসুন আমরা সবাই মিলে স্তন্যদানের পক্ষে সচেতনতা বৃদ্ধি করি এবং মাতৃদুগ্ধ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য সমাজে ছড়িয়ে দিই।


