
সফিকুল ইসলাম, বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধি।
কখনও কি ভেবে দেখেছি—একজন মানুষের কাঁধে কতটা দায়িত্ব চাপানো যায়? কতটা চাপ নিলেও সে ন্যূনতম সম্মানের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে? আমরা প্রতিনিয়ত সরকারি চাকরিজীবীদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, কখনও কখনও সমালোচনা করি। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো ম্লান হয়ে যায়, যদি চোখ রাখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরার কর্মকাণ্ডের দিকে।
এই একজন ইউএনও, যিনি এখন কার্যত পুরো উপজেলা প্রশাসনের একক চালিকাশক্তি। তার কাঁধে রয়েছে ৪৫টিরও বেশি পদ ও দায়িত্ব। তিনি শুধু একজন ইউএনও নন—একই সঙ্গে তিনি উপজেলার চারটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা ও দুটি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। তিনি বাজার কমিটির সভাপতি, বিভিন্ন উন্নয়ন কমিটির প্রধান, এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকায়, তিনিই সেখানে ভারপ্রাপ্ত।
এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে চলমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাস্তবতায়। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, দুই ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)—এই সব গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য। প্রশাসনিক বাস্তবতা বলে, এ অবস্থায় দায়িত্ব বর্তায় নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই দায়িত্ব কি ন্যায্য? একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে কি এতগুলো দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা বাস্তবসম্মত?
একজন জনপ্রতিনিধি জনতার নির্বাচিত প্রতিনিধি হলেও ইউএনও নিযুক্ত হন প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী। তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট। অথচ এখন তাকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, শিক্ষা, বাজার ব্যবস্থাপনা, আইন-শৃঙ্খলা—প্রতিটি ক্ষেত্রে এককভাবে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এতে প্রশাসনের ভারসাম্য যেমন বিঘ্নিত হয়, তেমনি জনসেবার ক্ষেত্রেও অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
তবে এটাও সত্য, ফেরদৌস আরা এই অস্বাভাবিক চাপের মাঝেও দায়িত্ব পালনে পিছু হটেননি। প্রতিটি কাজে তিনি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। লিখিত ও মৌখিকভাবে আসা প্রতিটি অভিযোগ শোনা, সমাধানের চেষ্টা, বিদ্যালয় পরিচালনা, বাজার তদারকি—সবখানে তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
একজন নারীর পক্ষে এমন বহুমাত্রিক প্রশাসনিক দায়িত্ব একাধারে পালন করা নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে বিকল্প কাঠামো না থাকলে, এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।
ফেরদৌস আরা ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসনীয় হলেও, এই পরিস্থিতি আমাদের শাসনব্যবস্থার একটি দুর্বল দিকও তুলে ধরে। দায়িত্ব এককেন্দ্রিক হলে, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়—ব্যক্তি নয়।