
এম,এ,মান্নান,স্টাফ রিপোর্টার,নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের করুণ বাস্তবতা আমাদের সমাজের এক গভীর অসাম্য ও অবহেলার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র আজ যখন বারবার কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলছে, দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল কারিগর—শিক্ষক—নিজেই চরম অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ভবন, যন্ত্রপাতি বা পাঠ্যক্রম দিয়ে চলে না; এগুলো চালনা করেন শিক্ষকরা—যারা নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও শ্রম দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অসংখ্য নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছেন। ২০-২৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষকতা করা শুধু কষ্টের নয়, এটি মানবিক মর্যাদারও পরিপন্থী।
এই শিক্ষকরা প্রতিদিন ক্লাস নেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখান, অথচ নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে তারা বাধ্য হন টিউশনি, ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য পেশায় যুক্ত হতে। অনেকেই সমাজে সম্মান বজায় রাখতে গিয়ে নিজের কষ্ট চেপে রাখেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন। তাদের এই নীরব যন্ত্রণা আমাদের চোখে পড়ে না, কারণ তারা প্রতিবাদ করতে গেলেও সেই প্রতিবাদের ভাষা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।
যখন এই শিক্ষকরা নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নামেন, তখন তাদের ওপর নেমে আসে আরেক নির্মম বাস্তবতা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিচার্জ, অবজ্ঞা ও দমন-পীড়ন তাদের ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে। যে শিক্ষক একদিন একজন ছাত্রকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, সেই ছাত্রই হয়তো আজ ক্ষমতার আসনে বসে সেই শিক্ষকের কষ্টের দিকে তাকানোর সময় পান না—এ এক নির্মম বৈপরীত্য।
এ যেন এক হারিয়ে যাওয়া কৃতজ্ঞতার গল্প। আমরা ভুলে যাই, একজন শিক্ষকই আমাদের প্রথম পথপ্রদর্শক। তার হাত ধরেই আমরা জীবনের পথে হাঁটতে শিখি, বড় হই, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হই। কিন্তু যখন সেই শিক্ষকই অবহেলিত হন, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
নন-এমপিও শিক্ষকদের এই দুর্দশা শুধু একটি পেশাগত সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। কারণ, শিক্ষক যদি অনিশ্চয়তায় থাকেন, তবে শিক্ষার মান কখনোই উন্নত হতে পারে না। আর শিক্ষার মান উন্নত না হলে একটি দেশ কখনোই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না।
তাই এখন সময় এসেছে এই সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। নন-এমপিও শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করা, ন্যায্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিত এই শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা।
একজন শিক্ষক কেবল একজন পেশাজীবী নন—তিনি একটি জাতির নির্মাতা। সেই নির্মাতার চোখে যদি জল থাকে, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই উজ্জ্বল হতে পারে না। তাই শিক্ষকদের এই কান্না থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।